আধ্যাত্মিক
রাজধানী নামে খ্যাত বিভাগীয় শহর সিলেটের পুণ্যভূমিতে যে ক’জন খ্যাতিমান
মনীষীর আবির্ভাব হয়েছে, তাদের মধ্যে আল্লামা আবদুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী রহ:
অন্যতম। ইসলামের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস ও জীবনভর ইসলামের খেদমতের
স্বীকৃতিস্বরূপ জনগণ তার জীবদ্দশায় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে
তাকে কুদওয়াতুস সালেকিন, জুবদাতুস আরেফিন, রঈসউল কোরবা ওয়াল মুফাসসিরিন,
উসতাজউল মুহাদ্দিসিন, আয়নায়ে জামালে আহমদী প্রভৃতি লকব ও খেতাবে বিভূষিত
করেন।
তিনি
ছিলেন বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী। সুদূর ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশে দ্বীনের
ঝাণ্ডা বুলন্দ করেছেন। ইলমুল ওহির আলোকে জিন্দেগি যাপনের পাশাপাশি সমাজে
ইসলামের শাশ্বত পয়গামের আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দিতে তিনি জানবাজি রেখে দাঈ
ইল্লাল্লাহুর দায়িত্ব পালন করেছেন। এ কারণেই বিশ্ববরেণ্য আলেমে দ্বীনের
তালিকায় তার নাম প্রথম পঙ্ক্তিতে লিপিবদ্ধ হওয়ার দাবিদার। সিলেটবাসী তার
গৌরবে গৌরবান্বিত। খেদমতে খালক বা মানবকল্যাণে নিবেদিত একজন সমাজসংস্কারক
হিসেবেও তার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। ২০০৮ সালের ১৬ জানুয়ারি তার
ইন্তেকালের পর দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় মনীষীদের শোক প্রকাশ এবং সংবাদ,
সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ-নিবন্ধে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের যে ধারা লক্ষ করা গেছে তা
তুলনাহীন।
আল্লামা
ফুলতলী রহ: একজন যুগশ্রেষ্ঠ তাসাউফপন্থী খ্যাতিমান আলেমে দ্বীন হয়েও তিনি
ছিলেন আজীবন বাতিল ও খোদদ্রোহী শক্তির বিরুদ্ধে নির্ভীক বজ্রকণ্ঠ মর্দে
মোজাহিদ। যেকোনো ইসলামবিরোধী কাজকর্মের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন তিনি দুর্জয়
সিন্দবাদের মতো। দ্বীনের সহিহ পথের পথনির্দেশ দিতেই তিনি আজীবন ত্যাগ ও
মেহনত করেছেন। অর্ধ শতাব্দীকালব্যাপী এই মনীষী নিজের সাধনা ও শ্রমে উম্মতে
মুহাম্মদির রুহানি তরক্কি বাড়াতে অনলস মেহনত করেছেন। তিনি ছিলেন
যুগশ্রেষ্ঠ নায়েবে নবী, আশেকে রাসূল সা: এবং লাখো কোটি ভক্তের ঈমানি
চেতনার পথপ্রদর্শক। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন রাজনৈতিক স্বাধীনতা
অর্জনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক বুদ্ধিবৃত্তিক স্বকীয়তা অর্জন
করাও একান্ত প্রয়োজন। মাসিক পরওয়ানা যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এ
দায়িত্বই আঞ্জাম দিয়ে চলেছে। আমাদের দেশে অনেক আলেম-ওলামা ছিলেন, আছেন ও
থাকবেন। কিন্তু ফুলতলীর রহ: সাথে কাতারবন্দী করা যায় এমন মনীষীর সংখ্যা
খুব বেশি পাওয়া যাবে না। তাকে অগণিত মানুষ আন্তরিকভাবে মহব্বতের সাথে
শ্রদ্ধা করেন ও ভালোবাসেন। এ ভালোবাসা যে কত নিখাঁদ ও গভীর তা ভাষায়
প্রকাশের ঊর্ধ্বে। কোনো মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি ভালোবাসা এমনিতেই
পয়দা হয় না। মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধের জন্য সন্তানের
চেষ্টা-প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয় নাÑ এটা আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকে দেয়া
শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। তবে এ কথা ঐতিহাসিক সত্য যে, মানুষ যার কাছ থেকে দুনিয়া ও
আখিরাতের কল্যাণের সহিহ দিকদর্শন লাভ করে তাকেও অধিক শ্রদ্ধা-মহব্বত করে।
আল্লামা ফুলতলী রহ:কে মানুষ ভালোবাসত দ্বীনের কারণেই। এ ভালোবাসা ছিল সব
ধরনের লাভ-লোভের ঊর্ধ্বে।
তিনি
১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার ফুলতলী গ্রামে এক
সম্ভ্রান্ত আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হজরত মাওলানা মুফতি
আবদুল মজিদ রহ: ছিলেন একজন বিখ্যাত আলেমে দ্বীন ও ফকিহ। তিনি অবিভক্ত
ভারতের বাংলা-আসামের একজন মশহুর আলেম ও বুজুর্গ ছিলেন এবং দেশময় ছিল তার
খ্যাতি। তিনি আজীবন মাদরাসায় অধ্যাপনাসহ দ্বীনের খেদমত করে যান।
ফুলতলী
মাদরাসায় তিনি প্রাথমিক আরবি শিক্ষা করেন। এ সময় তিনি কারী ফাতির আলীর
কাছে কিরাত শিক্ষা করেন। ১৩৩৬ বাংলায় তিনি হাইলকান্দি রাঙ্গাউঠা মাদরাসায়
ভর্তি হন। ১৩৩৮ বাংলায় বদরপুর সিনিয়র মাদরাসায় উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা
সমাপ্ত করেন। এরপর মাদরাসায়ে আলিয়া রামপুরে ভর্তি হয়ে ফনুনাত শেষ করে
মাতলাউল উলুম মাদরাসায় ভর্তি হন। তিনি ওই মাদরাসার চূড়ান্ত পরীক্ষায়
প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে ১৩৩৫ হিজরি সনে হাদিসের চূড়ান্ত সনদ
লাভ করেন।
কর্মজীবনের
প্রারম্ভে তিনি ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বদরপুর আলিয়া মাদরাসায়
শিক্ষকতা করেন। এরপর ১৯৫৪ সালে গাছবাড়ি জামেউল উলুম আলিয়া মাদরাসায় ছয়
বছর সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেন। তিনি সে সময় ভাইস প্রিন্সিপাল ও
প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর দীর্ঘ দিন সৎপুর আলিয়া
মাদরাসা ও ইছামতি আলিয়া মাদরাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে ইলমে হাদিসের শিক্ষা
দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সপ্তাহে দুই দিন ফুলতলী মাদরাসায় কামিল
জামাতে হাদিসের পাঠদান করাতেন। তার অর্ধশতাব্দীর শিক্ষকতা জীবনে তার গভীর
অনুভূতি ও বুদ্ধিদীপ্ত শিক্ষায় আলোকপ্রাপ্ত হয়েছেন অনেক শিক্ষার্থী। অতি
স্বল্প পরিসরে এই মহান ব্যক্তির জীবনের ওপর আলোকপাত করা নিতান্তই দুরূহ।
জাতির এ ক্রান্তিলগ্নে দেশ মাতৃকার জন্য তার মতো ব্যক্তিত্বের আজ বড়ই
প্রয়োজন। জাতি তার এ ঋণ কখনো শোধ করতে পারবে না। পরিশেষে মহান আল্লাহ
তায়ালার দরবারে প্রার্থনা করি তিনি যেন তার মায়ার ওলিকে জান্নাতুল
ফেরদাউস নসিব করেন। -আমিন
লেখক :
শফিক আহমদ শফি
সাংবাদিক
সাংবাদিক

No comments:
Post a Comment